ওয়েব কন্টেন্ট রাইটিং কী?

ওয়েব কন্টেন্ট রাইটিং কী?

আজকের লেখাটি ওয়েব কন্টেন্ট রাইটিং বা কপি-রাইটিং নিয়ে। কন্টেন্ট রাইটিং কি তা বুঝতে গিয়ে কন্টেন্ট মূলত কি, আগে কন্টেন্ট কেমন হতো আর এখন কেমন হচ্ছে, ওয়েব কন্টেন্ট এর সাথে গতানুগতিক অন্যান্য প্রচার মাধ্যমের জন্য তৈরি কন্টেন্ট কিভাবে আলাদা ইত্যাদি বিষয় সামনে চলে আসে।

গ্রাফিক্স ডিজাইন, ওয়েব ডেভলাপমেন্ট, সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং ইত্যাদি পেশার প্রতি মানুষের আকর্ষণ অনেক আগে থেকেই। এসব কাজে দক্ষতা অর্জনের জন্য সময় এবং অর্থ দুটোই বিনিয়োগ করতে হয়ে। এসব দিক বিবেচনায় কন্টেন্ট রাইটিং খুবই সোজা মনে করি আমরা। আসলেই কি তাই?

পৃথিবীর বুকে বিল্পব ঘটে যাচ্ছে। বলা হয়, চতুর্থ শিপ্ল বিল্পবের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি আমরা। এই বিল্পব সনাতন থেকে আধুনিকতা, এনালগ থেকে ডিজিটালাইজেশনের দিকে। পাল্টে যাচ্ছে বৈশ্বিক অর্থনীতির গতিপথ। পিছিয়ে নেই বাংলাদেশ। এই পরিবর্তনে গা ভাসাতে চায় এদেশের অধিকাংশ শিক্ষিত তরুণ। কন্টেন্ট ক্রিয়েশন হয়ে উঠছে তরুণদের পছন্দের পেশাগুলোর একটি।

কন্টেন্ট কী?

খুবই সাধারন একটি প্রশ্ন। উত্তরটাও সাধারন।

কারো কারো মতে, প্রকাশ করার উদ্দ্যেশ্যে যা কিছু লিখা হয় তাই কন্টেন্ট। খুব ভালো কথা। কিন্তু শুধু এই এক লাইনে কন্টেন্টের সংজ্ঞা নিরূপণ করতে চাইলে ভুল করবেন। প্রকাশ করার উদ্দ্যেশ্যে যা কিছু ‘লিখা’ হয় সেটা কন্টেন্ট এর একটা অংশ মাত্র। বরং আরেকটু ভালোভাবে বলা যায়, প্রকাশ করার উদ্দ্যেশ্যে যা কিছু লিখা তৈরি করা‘ হয় সেটা কন্টেন্ট। লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও সবই কন্টেন্ট এর আওতায় পরে। ইউটিউবাররা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, ফটোগ্রাফাররা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, গ্রাফিক ডিজাইনাররা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর, অডিওবুক পাবলিশার, মিউজিশিয়ান প্রত্যেকেই কন্টেন্ট ক্রিয়েটর।

বুঝতেই পারছেন, কন্টেন্ট ক্রিয়েশন নতুন কিছু নয়। হালের নতুন সংযোজন হলো ওয়েব কন্টেন্ট ক্রিয়েশন। মানে ইন্টারনেটের মাধ্যমে প্রচারের উদ্দ্যেশ্যে কন্টেন্ট তৈরি করা। প্রচার মাধ্যম পরিবর্তন হলেই কি সেটা নতুন হয়ে গেল? না। তাহলে?

আচ্ছা আরেকটু গভীর থেকে দেখা যাক।

অতি প্রাচীনকাল থেকে মূলত তিনটি উদ্দ্যেশ্যকে সামনে রেখে কন্টেন্ট তৈরি হয়ে আসছে। সেগুলো হলোঃ

  • তথ্য প্রকাশ এবং সংরক্ষণ

পাঠ্যপুস্তক, সংবাদ, ইতিহাসের বই, নির্দেশিকা প্রভৃতি হতে পারে এই ধরনের কন্টেন্টের উদাহরণ। এমন আরো অনেক উদাহরণ আছে যেগুলো আপাতত মাথায় আসছে না। যেগুলো বাদ গেল সেগুলো কমেন্টে দিয়ে দিন আমি পরে এখানে বসিয়ে নিবো।

  • বিনোদন মূলক

সিনেমার উদ্দাম নৃত্য, নাটক, আধুনিক টিকটক, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান, রিয়েলিটি শো সবই বিনোদনমূলক কন্টেন্ট। আরো তো আছে, মাথায় আসছে না, কি কি যেন বাদ পরে যাচ্ছে। ভাগ্যিস এটা ব্লগ, পাঠ্যপুস্তক না।

  • প্রচারণা মূলক

যেকোন ধরনের পণ্য কিংবা সেবা অথবা তথ্য/নির্দেশিকা প্রচারনার উদ্দ্যেশ্যে যেসকল কন্টেন্ট তৈরি হয় সেগুলোই প্রচারণামূলক কন্টেন্ট। এখানে বলে রাখি, এই ধরনের কন্টেন্ট রাইটিংকে কপিরাইটিং বলে। ভিডিও বিজ্ঞাপনের স্ক্রিপ্ট, জিংগেল কিংবা গ্রাফিক্স বিজ্ঞাপনের ক্যাপশন সবই কপিরাইটিং এর আওতাধীন।

আমি বলেছি তথ্য বা নির্দেশিকাও প্রচারের উদ্দ্যেশ্যে বিজ্ঞাপন বানানো হয়ে থাকে। এইখানে হাল্কা ভেবাচেকা লাগতে পারে। তথ্য আবার কেউ প্রচার করে নাকি? জ্বী ভাই,

বেশি করে আলু খান, ভাতের উপর চাপ কমান

এই দিন দিন না আরো দিন আছে, এই দিনেরে নিতে হবে সেই দিনের ও কাছে

আপনার সন্তানকে ভিটামিন-এ খাওয়ান

এগুলা সবই কোন না কোন তথ্য বা নির্দেশিকার বিজ্ঞাপন ছিলো। আহারে সেইসব দিন! আরো কি কি যেন ছিলো?

ওয়েবের জন্য কি তবে এধরনের কন্টেন্ট রাইটিং প্রয়োজন হয় না?

জ্বী অবশ্যই প্রয়োজন হয়। বরং অন্য যেকোন প্রচার মাধ্যমের চাইতে ওয়েব কন্টেন্টের চাহিদা বর্তমানে তুংগে! আয়মান সাদিকের টেন মিনিট স্কুল হয়ে উঠেছে পাঠ্যপুস্তকের বিকল্প। অনলাইন নিউজপেপার এডিটররা এখন ঘরে ঘরে, ইতিহাস জমছে উইকিপিডিয়ায়, ইউজার ম্যানুয়েল আগে ছিলো দেড় কেজি ওজনের বই, এখন সিম্পল QR কোড।

সিনেমা নাটকের জায়গা দখল করছে ওয়েব সিরিজ, ম্যাগাজিন অনুষ্ঠানের চাইতে প্র্যাংক ভিডিওর ভিউ বেশি। সবকিছুকে ছাপিয়ে সবচাইতে বেশি পরিবর্তন এসেছে বিজ্ঞাপনী কন্টেন্টে। আগেকার যুগের ২৫-৩০ সেকেন্ডের বিজ্ঞাপনী ভিডিও ওয়েবে অচল। ৭ সেকেন্ডের বেশি সময় অডিয়েন্সের মনোযোগ ধরে রাখা এখন সাকিব আল হাসানের জন্য ও চ্যালেঞ্জিং।

আগে পত্রিকার প্রথম পাতায় ছাপা হওয়া বিজ্ঞাপনের জন্য বড়জোর দুই থেকে তিন শব্দের লেখার সাথে নজরকাড়া গ্রাফিক্স জুড়ে দিলেই হতো। কপিরাইটারদের কাজের চাপ ছিলো কম, মনোযোগ দিতে পারতো সৃজনশীলতায়। শুধু শুধু কী আর লোকে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে দিয়ে বিজ্ঞাপনের কপি লেখানোর বায়না ধরতো!

এদেশে পণ্যের মোড়কে লেখা মেয়াদোত্তীর্ণের নির্দেশনাই ঠিকভাবে পড়েনা কেউ, তাই মোড়কের গায়ে বিজ্ঞাপন সাঁটানো ছিলো উলুবনে মুক্তো ছড়ানো। পণ্যের সাথে কিছু যদি মুফতে দেওয়া হয়, তবে সেটাই বড় বড় করে লিখে দিলে হয়।

ওয়েব কন্টেন্ট ব্যাপারটা সেই দুই পাতা গ্রাফিক্স আর দু লাইনের কপিরাইটিং কে ছাড়িয়ে বহুদূর এসেছে। ওয়েবে ক্রেতা যেকোন পণ্য কেনার আগে পণ্যের সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে পুরোপুরি কন্টেন্টের উপর নির্ভর করে থাকে। ভালোমানের কপিরাইটিং অচল মালকেও ক্রেতার চোখে লোভনীয় করে তুলতে পারে।

ব্রিক এন্ড মর্টার শপে ক্রেতা প্রবেশ করে, ঘুরেফিরে হাজারটা প্রশ্ন করে পণ্য হাতে নিয়ে যাচাই বাছাই করে কেনার সুযোগ পায়। অনলাইন শপগুলোয় সে সুযোগ নেই। অনলাইন শপে গিয়ে যেকোন পণ্য সম্পর্কে জানার জন্য সংশ্লিষ্ট সাইটের কন্টেন্ট ক্রেতার তথ্য সংগ্রহের একমাত্র উৎস।

একজন ভালো বিক্রয় প্রতিনিধির মূল কাজ হলো পণ্যের প্রতি ক্রেতার আস্থা তৈরি করা, তেমনি একজন ভালো কপিরাইটার তার লেখার গুণে আস্থা তৈরির মাধ্যমে অনলাইন ভিজিটরকে ক্রেতায় কনভার্ট করতে পারেন। পণ্য যতোই চকচকে হোক, দাম যতোই কম হোক, ক্রেতার আস্থা তৈরি করতে ব্যার্থ হলে ক্রেতা ফিরে যাবেই।

ওয়েব কন্টেন্ট তৈরির সময় ক্রেতার চাহিদার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন সবার আগে। ক্রেতার চাহিদাকে ছকে ফেলে কন্টেন্ট প্ল্যান সাজানো এবং সেই অনুযায়ী কন্টেন্ট তৈরি করাই ওয়েব কন্টেন্ট তৈরির মূল চ্যালেঞ্জ।

ওয়েব কন্টেন্ট রাইটিং এর বিবেচ্য বিষয়

[sociallocker]
  • অনলাইনে সবাই চোখ বুলিয়ে যায়। মানুষ অনলাইনে উপন্যাস পড়তে আসে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই মানুষ চায় নির্দিষ্ট কিছু তথ্য খুঁজে নিতে।
  • কেতাবি ভাষা অনলাইনে অচল। যে লেখা যতো সাবলীল সেটা পড়তে ততো আরাম।
  • ইনিয়ে বিনিয়ে নিজের লেখার বিষয়বস্তু তুলে ধরা কথা সাহিত্যিকদের কাজ। ওয়েবকপি রাইটারদের কাজ মানুষকে তার কাঙ্ক্ষিত তথ্য সরবরাহ করা। কোন কন্টেন্ট এ কি থাকবে তা একদম শুরুতেই বলে না দিলে পাঠক হারানো লাগে।
  • ধরি আপনি স্মার্টফোন বিক্রি করবেন। আপনার ওয়েব কপিতে আপনি লিখলেন antutu benchmark score, Heat score, cooling mechanism সবদিক বিবেচনায় আপনার ফোন এগিয়ে আছে। এটা কি আদৌ কাস্টোমারকে সঠিক তথ্য দিলো? লেখায় এই ধরনের শব্দাবলী, যেগুলো ইন্ডাস্ট্রির ভেতরের লোকজন ব্যবহার করে সেগুলো ব্যবহার আপনাকে পাঠকের চোখে পন্ডিত হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে, কিন্তু সেই লেখা দিয়ে বিক্রি আশা করা যায় না। একজন ক্রেতার কেনার সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে চাইলে ক্রেতার দৃষ্টিকোণ থেকে লিখতে হবে।
  • লেখায় যা কিছু থাকবে তা অবশ্যই নির্ভরযোগ্য হতে হবে। আমার মনে চাইলো আর আমি লিখে দিলাম। কেউ যদি আপত্তি জানায় তখন উপযুক্ত দলিল দেখাতে পারলাম না। আমার সেই লেখা মূল্যহীন।
  • যেকোন কন্টেন্টকে সময় উপযোগী হতে হবে। বাতিল হয়ে যাওয়া তথ্য উপাত্তের উপর ভিত্তি করে কিছু লিখলে সেটা গ্রহণযোগ্যতা হারাবে।
[/sociallocker]

মনে রাখা প্রয়োজন যে ওয়েব কন্টেন্ট এর উদ্দ্যেশ্য অনলাইন ভিজিটরদের আস্থা অর্জনের মাধ্যমে তাদেরকে দিয়ে নিজের উদ্দেশ্য হাসিল করা। হোক সেটা কিছু কেনানো অথবা কন্টেন্ট শেয়ার করা অথবা শুধুই পড়ানো। উদ্দ্যেশ্য যেটাই হোক, কার্যসিদ্ধির মূলমন্ত্র হলো ভিজিটরের আগ্রহ ধরে রাখা

কন্টেন্টের নানা দিক আমার মতো করে লেখার চেষ্টা করছি। এটা চালিয়ে যাওয়া উচিৎ কিনা তা কমেন্টে জানাবেন। এছাড়া আপনাদের যেকোন মতামত, চাহিদা, পরামর্শ কিংবা প্রশ্ন থাকলে সেটাও জানাবেন। নিজে না জানলে গুগল করে হলেও আপনাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে চেষ্টা করবো।

আচ্ছা, গুগল কন্টেন্টকে কিভাবে দেখে সেটা কি বলেছি?

আচ্ছা থাক, সেটা আগামীতে বলবো। সেই লেখাটা মিস করতে না চাইলে আপনার ইমেইল নোটিফিকেশন চালু করে রাখুন এখানে

  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
>
Scroll to Top